রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির দলীয় প্রার্থী নজরুল ইসলাম মণ্ডল নিজ দলেরই দুই বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পুঠিয়া বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ইসপা খাইরুল হক শিমুল ও যুক্তরাজ্য জিয়া পরিষদের সহ-সভাপতি রেজাউল করিম। তাদের অনড় অবস্থানের কারণে এই আসনে বিএনপির নেতাকর্মী ও ভোটাররা কার্যত তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি গত ১৯ জানুয়ারি এই দুই বিদ্রোহীকে বহিষ্কার করলেও তারা দমে যাননি। বরং বহিষ্কারাদেশকে তোয়াক্কা না করে তারা পুরোদমে নির্বাচনি প্রচার ও গণসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন। উভয় বিদ্রোহী প্রার্থীই আর্থিকভাবে বেশ শক্তিশালী এবং নিজেদের জয়ের ব্যাপারেও যথেষ্ঠ আত্মবিশ্বাসী। গত ৩ নভেম্বর দলীয় মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মণ্ডলের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ অবস্থান নেয় দলের একটি বড় অংশ। মনোনয়ন চূড়ান্ত করার আগে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও মহাসড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচিও পালন করেন তারা। চূড়ান্ত মনোনয়নের পরেও নেতাকর্মীদের একাংশের সেই অসন্তোষ কাটেনি।
নির্বাচনি প্রক্রিয়া চলাকালীন বিএনপির চারজন মনোনয়নপ্রত্যাশী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেও খাইরুল হক শিমুল ও রেজাউল করিম তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে তারা আরো জোরালো প্রচার চালাচ্ছেন এবং দলের বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মীকে নিজেদের প্রচারে যুক্ত করেছেন। নির্বাচনে যেকোনো মূল্যে জয়ী হতে মরিয়া এই দুই বিদ্রোহী ভোটের মাঠে প্রচুর অর্থ ব্যয় করছেন বলেও জানা গেছে। ফলে নির্বাচনের মাঠে দলীয় কর্মী ও সাধারণ ভোটারদের মাঝে বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মণ্ডল একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ হলেও তার বিপরীতে বিদ্রোহী দুই প্রার্থী আর্থিক সক্ষমতায় অনেক বেশি বলিষ্ঠ। বিএনপির সাধারণ নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ তাদের সঙ্গে প্রচারে নেমেছেন এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে ভোট চাইছেন। এছাড়া এই আসনে ভোটের মাঠে অঞ্চলভিত্তিক প্রভাবও একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। নজরুল ইসলাম মণ্ডল পুঠিয়াভিত্তিক রাজনীতিতে সক্রিয় হলেও বিদ্রোহী প্রার্থী রেজাউল করিমের শক্ত ঘাঁটি রয়েছে দুর্গাপুরে। ফলে এই আঞ্চলিক বিভাজনও বিএনপির ভোট ব্যাংকে ফাটল ধরাচ্ছে।
দুর্গাপুর উপজেলা বিএনপির একাধিক নেতা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, রাজশাহী-৫ আসনটি ঐতিহ্যগতভাবে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বিদ্রোহী প্রার্থীরা মাঠে অনড় থাকায় ভোট তিন ভাগে বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এমন পরিস্থিতিতে এই বিভাজনের সুযোগ নিয়ে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা মনজুর রহমান সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যেতে পারেন। এলাকায় জামায়াত প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরাও নির্বাচনি প্রচারে বেশ সক্রিয় রয়েছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিভক্তি বিএনপির দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে এবং ভোটারদের মধ্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সংকট সমাধানে এখন সবাই দলীয় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ভূমিকার দিকে তাকিয়ে আছেন।
পুঠিয়া উপজেলার বিএনপির কর্মী রাসেদুল ইসলাম বাবু বলেন, ‘বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে সহজেই জয় সম্ভব ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি বেশ জটিল হয়ে গেছে।’
অন্যদিকে বিদ্রোহী প্রার্থী রেজাউল করিম বলেন, ‘এলাকার মানুষের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমি প্রার্থী হয়েছি। এমনকি নির্বাচনের জন্য যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্বও ত্যাগ করেছি। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমার ‘ফুটবল’ প্রতীকই জয়ী হবে।’
সার্বিক বিষয়ে বিএনপির দলীয় প্রার্থী নজরুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, ‘সাময়িক বিভ্রান্তি থাকলেও বিএনপির ভোট শেষ পর্যন্ত ধানের শীষেই পড়বে। দলীয় কর্মীরা সব বিভেদ ভুলে মাঠে নামবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।’