আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এক নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) প্রচারিত এই ভাষণে তিনি বেকার সমস্যা সমাধান, নারীদের ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্যখাত সংস্কার এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষাসহ একাধিক যুগান্তকারী প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।
তিনি বলেন, “দীর্ঘ দেড় দশকের আন্দোলন ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে হাজারো প্রাণের বিনিময়ে জনগণের কাছে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরে আসার মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জনগণের বহুল আকাঙ্ক্ষিত জাতীয় নির্বাচন।”
বেকারত্ব দূরীকরণ ও ১ কোটি কর্মসংস্থান তারেক রহমান ঘোষণা করেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দেশে-বিদেশে ১ কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
-
বেকার ভাতা: স্নাতক ডিগ্রিধারীসহ শিক্ষিত বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত ৬ মাস থেকে ১ বছর বিশেষ ‘আর্থিক ভাতা’ প্রদান করা হবে।
-
আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং: আইটি সেক্টরে প্রতিবছর ২ লাখ এবং পরোক্ষভাবে ৮ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে। হাই স্কুল পর্যায় থেকে কারিগরি শিক্ষা ও তৃতীয় একটি ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে যাতে ড্রপআউট শিক্ষার্থীরাও দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ২৫০০ টাকা নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বিএনপি প্রথমবারের মতো ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
-
পরিবারের নারী প্রধানের নামে এই কার্ড ইস্যু করা হবে।
-
প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতিমাসে ২,৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে, যা পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে।
-
নারীদের জন্য স্নাতকোত্তর পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা অব্যাহত রাখা হবে এবং কর্মজীবী নারীদের জন্য ইলেকট্রিক পরিবহন, ডে-কেয়ার সেন্টার ও হাইজিনিক বাথরুম নির্মাণ করা হবে।
কৃষক ও স্বাস্থ্যখাত
-
কৃষি: ‘বাঁচলে কৃষক বাঁচবে দেশ’—এই নীতিতে কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার্স কার্ড’ ইস্যু করা হবে, যার মাধ্যমে তারা সরকারি প্রণোদনা ও তথ্য পাবেন।
-
স্বাস্থ্য: ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’—এই নীতিতে সারা দেশে ১ লাখ হেলথকেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগ দেওয়া হবে, যার ৮০ শতাংশই হবেন নারী। তারা ইউনিয়ন পর্যায়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রাথমিক সেবা দেবেন।
ধর্ম ও সংবিধান তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সংবিধানে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ বাক্যটি পুনরায় সন্নিবেশ করা হবে। এছাড়া দেশের প্রায় ২ লাখ মসজিদ, মন্দির ও প্যাগোডার ইমাম, মুয়াজ্জিন ও ধর্মগুরুদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে আর্থিক সম্মানী বা ভাতার ব্যবস্থা করা হবে। তিনি বলেন, “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব।”
প্রবাসী ও প্রতিবন্ধী কল্যাণ প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু করা হবে, যার মাধ্যমে বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধ ও বিনিয়োগ সুরক্ষা মিলবে। এছাড়া বিদেশে যেতে ইচ্ছুক দক্ষ শ্রমিকদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হবে। দেশের ৪০ লাখ প্রতিবন্ধী মানুষের জন্যও রাষ্ট্রের বিশেষ দায়বদ্ধতার কথা জানান তিনি।
অতীতের ভুল ও ক্ষমা প্রার্থনা অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তিনি বলেন, “অতীতে দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে আমাদের অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুল-ত্রুটি হয়েছে। সেজন্য আমি দেশবাসীর কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামীর নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে আমি আপনাদের সমর্থন চাই।”
দুর্নীতি রোধ ও অর্থায়ন এই বিশাল কর্মযজ্ঞের অর্থায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ফ্যাসিবাদ আমলে প্রতিবছর দেশ থেকে ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হতো। দুর্নীতি ও পাচার রোধ করা গেলে ফ্যামিলি কার্ড বা বেকার ভাতা দেওয়ার মতো উদ্যোগ বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়।”
ভাষণের শেষে তিনি ১২ ফেব্রুয়ারি সারা দিন ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আপনারা ১২ তারিখ ধানের শীষের প্রার্থীদের দায়িত্ব নিন, ১৩ তারিখ থেকে আপনাদের নির্বাচিত এমপিরা আপনাদের দায়িত্ব নেবে—ইনশাআল্লাহ।”