ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসতে যাচ্ছে আগামী ১২ মার্চ। এই অধিবেশনের প্রথম বৈঠকেই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। সাধারণত বিদায়ী স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। কিন্তু পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এবার স্পিকার নির্বাচনের সময়টাতে কে সভাপতিত্ব করবেন, সেই প্রশ্ন বড় হয়ে সামনে এসেছে।
প্রেক্ষাপট ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এর দেড় বছর পর ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের প্রথম অধিবেশন ডাকতে হবে।
অধিবেশনের প্রস্তুতি ও আলোচ্যসূচি গত রোববার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রথম অধিবেশনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, আগামী ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতি সংসদ অধিবেশন আহ্বান করবেন। তিনি বলেন, এই অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশগুলো উত্থাপন, শোক প্রস্তাব এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণ হবে। তবে প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব কে করবেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সভাপতিত্ব নিয়ে আইনি জটিলতা সংবিধান ও সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, স্পিকার নির্বাচনের কাজটি বিদায়ী স্পিকারের সভাপতিত্বে হয়ে থাকে। দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করেন এবং বিদায়ী ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক (টুকু) হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।
সাধারণত গেজেট প্রকাশের পর বিদায়ী স্পিকার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান। কিন্তু এবার এর ব্যতিক্রম হয়েছে। তিন দিনের মধ্যে স্পিকার বা তাঁর মনোনীত ব্যক্তি শপথ না পড়ানোয় গত মঙ্গলবার নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন।
সংবিধান ও কার্যপ্রণালি বিধি কী বলে? বিদ্যমান সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে বলা আছে, সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন। ৭৪(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয়ের পদ শূন্য থাকলে কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য স্পিকারের দায়িত্ব পালন করবেন।
কার্যপ্রণালি বিধির ৫ নম্বর ধারায় বলা আছে, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয় পদ শূন্য থাকলে স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংসদ সদস্যদের শপথ পরিচালনা ও সংসদে সভাপতিত্ব করার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত কোনো ব্যক্তির সামনে শপথ নেবেন। যেহেতু শপথ সিইসি পড়িয়েছেন, এখন শুধু স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংসদে সভাপতিত্ব করার জন্য রাষ্ট্রপতি কাউকে মনোনয়ন দিতে পারেন কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
অন্যদিকে, কার্যপ্রণালি বিধির ২১ ধারায় বলা আছে, স্পিকার বা কার্যপ্রণালি বিধির অধীন যোগ্যতাসম্পন্ন অন্য কোনো সদস্য সংসদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করলে বৈঠক যথাযথভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে গণ্য হবে। আবার ১২(২) বিধিতে বলা আছে, কেউ উপস্থিত না থাকলে সংসদ একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে সভাপতিত্ব করার জন্য নির্বাচিত করবেন। তবে এটি প্রথম বৈঠকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি না, তা নিয়ে মতভিন্নতা আছে।
বিশেষজ্ঞের মত সংসদবিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ বলেন, “এবার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিইসি শপথ পড়িয়েছেন। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ৫ ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির মনোনীত (প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে) কোনো ব্যক্তি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সভাপতিত্ব করতে পারেন।”