‘জীবিত অবস্থায় কোলে নিতে পারলাম না’: যশোর জেলগেটে স্ত্রী-সন্তানের লাশের সামনে ছাত্রলীগ নেতার আর্তনাদ, ভাইরাল শেষ চিঠি!

ডেস্ক রিপোর্ট
 ছবি:
ছবি:

বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি (নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন) জুয়েল হাসান ওরফে সাদ্দাম তার স্ত্রী ও ৯ মাসের শিশুপুত্রের জানাজায় অংশ নিতে প্যারোল পাননি। আইনি জটিলতা ও আবেদন প্রক্রিয়ার ভুলের কারণে প্যারোল না মেলায় শনিবার (২৪ জানুয়ারি ২০২৬) রাত পৌনে ৮টার দিকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে অ্যাম্বুলেন্সে করে স্ত্রী-সন্তানের লাশ আনা হয় তাকে শেষবার দেখানোর জন্য।

সেখানে মাত্র ৫ মিনিটেরও কম সময় পান সাদ্দাম। হাতকড়া পরা অবস্থায় নিজের মৃত সন্তানকে কোলে নিতে না পারার আক্ষেপ আর আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে জেলগেটের বাতাস।

কারাফটকে শেষ দেখা ও সাদ্দামের আর্তনাদ স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা (স্বর্ণালী) ও শিশু সেজাদ হাসানের (নাজিফ) মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন সাদ্দাম। সাদ্দামের ভাই শহিদুল ইসলাম জানান, সাদ্দাম আক্ষেপ করে বলেন: “জীবিত অবস্থায় আমি আমার বাচ্চাকে কোলে নিতে পারলাম না, মৃত্যুর পর কোলে নিয়ে কী করব? আমি ভালো বাবা হতে পারলাম না, আমি ভালো স্বামী হতে পারলাম না। আমাকে ক্ষমা করে দিও।” কানিজের বাবা রুহুল আমিন জানান, ৫ মিনিট সময় পেলেও সাদ্দাম সন্তানকে আর কোলে নেননি, শুধু কানিজকে জড়িয়ে ধরে বিদায় জানান।

মৃত্যুর ঘটনা ও রহস্য গত শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাট সদরের সাবেকডাঙ্গা গ্রামে নিজ ঘর থেকে কানিজ সুবর্ণার ঝুলন্ত মরদেহ এবং বাথরুমের বালতির পানিতে চুবানো অবস্থায় শিশু সেজাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

  • চিকিৎসকের বক্তব্য: বাগেরহাট জেলা হাসপাতালের চিকিৎসক সাকিয়া হক জানান, শিশুটিকে যখন আনা হয় তখন পালস ছিল না। পানিতে পড়ার পেশেন্ট ভেবে ৪৫ মিনিট ‘রেসকিউ ব্রেথ’ দিয়ে চেষ্টা করেও তাকে বাঁচানো যায়নি।

  • ময়নাতদন্ত: বাচ্চার মস্তিষ্ক ও ফুসফুসে পানি পাওয়া গেছে। কানিজের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না।

  • মামলা: কানিজের বাবা রুহুল আমিন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন।

প্যারোল না পাওয়ার কারণ: আমলাতান্ত্রিক জটিলতা? সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তি না পাওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় চলছে। তবে প্রশাসন বলছে, এটি মূলত ভুল জায়গায় আবেদনের ফল।

  • পরিবারের ভাষ্য: সাদ্দামের মামা হেমায়েত উদ্দিন জানান, তারা শুক্রবার বাগেরহাটের ডিসি অফিসে এবং পরে ডিসির বাংলোয় গিয়ে আবেদন করেন। কিন্তু জেল সুপার জানান, বন্দী বাগেরহাটে নেই, তাই এখান থেকে প্যারোল দেওয়া সম্ভব নয়। হেমায়েত উদ্দিনের আক্ষেপ, “আমরা তো জানিই না যশোরে আবেদন করতে হবে। এটা তো কেউ আমাদের বলেনি।”

  • বাগেরহাটের ডিসি: জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, প্যারোল নীতিমালা (২০১৬) অনুযায়ী বন্দী যে জেলার কারাগারে থাকেন, সেই জেলার ম্যাজিস্ট্রেট সিদ্ধান্ত দেবেন। সাদ্দাম যেহেতু যশোরে বন্দী, তাই বাগেরহাটের ডিসির সেই ক্ষমতা ছিল না।

  • যশোরের ডিসি: জেলা প্রশাসক আশেক হাসান জানান, সাদ্দামের পরিবারের পক্ষ থেকে যশোর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা কারাগার কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো আবেদনই করা হয়নি। মানবিক দিক বিবেচনায় জেলগেটে লাশ দেখানো হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ফয়সল হাসান এবং সহকারী কারা মহাপরিদর্শক মো. জান্নাত-উল ফরহাদ স্পষ্ট করেছেন, প্যারোল দেওয়ার এখতিয়ার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের। যশোর জেলায় কোনো আবেদন না পড়ায় প্যারোল দেওয়া সম্ভব হয়নি। এখানে কারা কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি নেই।

প্রেক্ষাপট ২০২৫ সালের এপ্রিলে গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হন সাদ্দাম। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে ১১টি মামলা রয়েছে। গত ১৫ ডিসেম্বর তাকে বাগেরহাট থেকে যশোর কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। স্বামীর মুক্তি না মেলায় এবং সামাজিক চাপে কানিজ সুবর্ণা মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন বলে স্থানীয়দের ধারণা।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত