অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স লিমিটেডের সাবেক প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মো: রাজিব হোসেনের (৪১) বিরুদ্ধে ভয়াবহ আর্থিক জালিয়াতি, বিশ্বাসভঙ্গ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। একসময়ের সাধারণ চাকরিজীবী রাজিব বর্তমানে ঢাকা ও পটুয়াখালীতে বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিক। তার এই রাতারাতি বিত্তবৈভবের পেছনের আয়ের উৎস নিয়ে সাধারণ সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
জালিয়াতি ও মামলার কবলে রাজিব
অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স লিমিটেড কর্তৃপক্ষ সাম্প্রতিক এক সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, কোম্পানিটিতে কর্মরত থাকাকালীন রাজিব হোসেন প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এই ঘটনায় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় তার বিরুদ্ধে একটি মামলা চলমান রয়েছে (মামলা নং- ১৩(৩)২০২১)।
কোম্পানির পক্ষ থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে যে, রাজিব হোসেনের সাথে কোম্পানি সংক্রান্ত কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন না করার জন্য। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, তার সাথে লেনদেনের কোনো দায়ভার কোম্পানি নেবে না।
অতীতে তার বিরুদ্ধে আনুমানিক ১৫ কোটি টাকা চুরির অভিযোগে তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুন-অর-রশিদের হাতে গ্রেফতার হওয়ার এবং জেল খাটার রেকর্ড রয়েছে। সেই সময় কোম্পানিটির পক্ষ থেকে তার ছবিসহ ‘চোর’ ও ‘প্রতারক’ চিহ্নিত পোস্টার ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সাঁটানো হয়েছিল।
ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ
০৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর রাজিব হোসেন নিজেকে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি বাউফল উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক তসলিম তালুকদারের খালাতো ভাই পরিচয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন।
তার ফেসবুক আইডি (Razib Hossain FCA) বিশ্লেষণে অতীতে ফ্যাসিবাদের সাথে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সচেতন মহলের প্রশ্ন—কার এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিনি বারবার বিভিন্ন বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দিচ্ছেন?
বেনজীর আহমেদের ঘনিষ্ঠতা ও কালো টাকার বিনিয়োগ
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের সাথে রাজিব হোসেনের অত্যন্ত গোপন ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, বেনজীর আহমেদ দেশ ছাড়ার পূর্বে বিপুল অঙ্কের অবৈধ অর্থ রাজিবের কাছে গচ্ছিত রেখে যান।
সেই ‘কালো টাকা’র দাপটেই তিনি কালাইয়া বাজারের ইজারা সরকারি কোষাগারে ৫ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা জমাদানের মাধ্যমে একক আধিপত্য বিস্তার করে হাতিয়ে নিয়েছেন, যা স্থানীয় নেতাদের মতে ওই বাজারের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বহুগুণ বেশি।
বিশাল সাম্রাজ্য ও স্থাবর সম্পত্তির বিবরণ
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার মদনপুরা গ্রামের বাসিন্দা রাজিব হোসেনের আয়ের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের ফিরিস্তি নিম্নরূপ:
১. গুলশান-১: একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট (ফ্ল্যাট নং- SE-১, বাড়ী নং-১৬, রোড নং-১০)।
২. স্থাবর সম্পত্তি: ১৬/০৬/২০২৫ তারিখের দলিল (দলিল নং- ৩০১১) অনুযায়ী ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার সম্পত্তি।
৩. নির্মাণাধীন ভবন: ০৭/০৯/২০২৫ তারিখে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের ৪ তলা ভবনের কাজ চলমান।
৪. অতিরিক্ত সম্পত্তি: ০৮/০৯/২০২৫ তারিখে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার আরও একটি দলিল।
৫. কালাইয়া বাজার: বার্ষিক ইজারা মূল্য ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা (২০২৬)।
৬. বাউফল পৌরসভা: ৪ নং ওয়ার্ডে খতিয়ান নং- ৩৩১ জমির মূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা।
৭. বাউফল ডিগ্রি কলেজ এলাকা: ২ নং ওয়ার্ডে প্রায় ১ কোটি টাকার জমি।
তদন্তের দাবি
এত বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির বৈধ আয়ের উৎস, টিআইএন (TIN) নথি ও ব্যাংক লেনদেনের অস্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী। একজন চিহ্নিত অর্থ আত্মসাৎকারী ও ষড়যন্ত্রকারীকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।
অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজিব হোসেনের সম্পদের হিসাব খতিয়ে দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য মো: রাজিব হোসেনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।