টেস্ট ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের শক্তির পার্থক্য বরাবরই বড়। টেস্ট র্যাংকিংয়ে অস্ট্রেলিয়া শীর্ষে, বাংলাদেশ নবম। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের টেস্ট খেলার সুযোগও এসেছে খুব কম। সর্বশেষ ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে দুই টেস্টেই বড় ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ।
এরপর কেটে গেছে প্রায় ২৩ বছর। অবশেষে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আবারও টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়ে এবার আর খালি হাতে ফিরতে হলো না বাংলাদেশকে। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
এটি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট ইতিহাসে বাংলাদেশের দ্বিতীয় জয়। এর আগে ২০১৭ সালে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ।
হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত বোলিং
বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের মূল ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ম্যাচের প্রথম দিনেই। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশের পেসারদের তোপের মুখে পড়ে অস্ট্রেলিয়া।
হাসান মাহমুদের ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট হয় স্বাগতিকরা। ১৭ ওভারে ৫৫ রান দিয়ে ৬ উইকেট নেন হাসান। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে কোনো বাংলাদেশি বোলারের এটিই সেরা বোলিং।
তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেনও তাঁকে দারুণভাবে সহযোগিতা করেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের ১০টি উইকেটই তুলে নেন বাংলাদেশের পেসাররা।
তানজিদের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি
বোলারদের দেওয়া সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগান বাংলাদেশের ব্যাটাররা। মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নামা তানজিদ হাসান তামিম অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী পেস আক্রমণের সামনে অসাধারণ ব্যাটিং করেন।
১৯৭ বলে ১০১ রান করেন তিনি। আটটি চার ও একটি ছক্কায় সাজানো তাঁর ইনিংসটি ছিল ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো বাংলাদেশি ব্যাটারের প্রথম টেস্ট শতক।
তানজিদের সঙ্গে ১০২ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন মুমিনুল হক। পরে নাজমুল হোসেন শান্ত ৮৪ এবং মেহেদী হাসান মিরাজ ৬৫ রান করে বাংলাদেশের লিড আরও বাড়িয়ে দেন।
শেষ পর্যন্ত ৪২৬ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে ২২৮ রানের বিশাল লিড পায় তারা।
দ্বিতীয় ইনিংসেও অস্ট্রেলিয়াকে চাপে রাখে বাংলাদেশ
বড় ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে নেমেও শুরুতেই হাসান মাহমুদের সামনে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। আবারও জেক ওয়েদারাল্ড ও ট্রাভিস হেডকে ফিরিয়ে দেন এই পেসার।
তবে এবার প্রতিরোধ গড়েন মার্নাস লাবুশেন, স্টিভেন স্মিথ ও ক্যামেরন গ্রিন। লাবুশেন করেন ৩১, স্মিথ ৪৪ রান। এরপর একাই লড়াই করেন গ্রিন।
১৯২ বলে ১০৪ রানের সেঞ্চুরি করেন তিনি। তাঁর লড়াইয়ে অস্ট্রেলিয়া কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের সামনে টিকতে পারেনি।
মিরাজের ঘূর্ণিতে শেষ অস্ট্রেলিয়া
দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের স্পিন আক্রমণের নেতৃত্ব দেন মেহেদী হাসান মিরাজ। প্যাট কামিন্স, অ্যালেক্স ক্যারি, বিউ ওয়েবস্টার ও নাথান লায়নকে ফিরিয়ে দেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত ৬৬ রানে ৫ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস গুটিয়ে দেন মিরাজ। হাসান মাহমুদ নেন আরও ৩ উইকেট। তাসকিন আহমেদ ও তাইজুল ইসলাম নেন একটি করে।
অস্ট্রেলিয়া অলআউট হয় ২৮৪ রানে। বাংলাদেশের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।
মাত্র ১৪.২ ওভারে জয়
ছোট লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। জশ হ্যাজেলউডের বলে শূন্য রানে বোল্ড হয়ে ফিরে যান ঐতিহাসিক সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ।
তবে এরপর আর কোনো বিপদ হতে দেননি মুমিনুল হক ও সাদমান ইসলাম। দ্বিতীয় উইকেটে তাঁদের অবিচ্ছিন্ন ৫৩ রানের জুটিতে মাত্র ১৪.২ ওভারে লক্ষ্যে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ।
মুমিনুল অপরাজিত থাকেন ৩০ রানে, সাদমান অপরাজিত ২৫ রানে।
বাংলাদেশ জয় পায় ৯ উইকেটে।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে ২৩ বছর আগের অস্ট্রেলিয়া সফরের স্মৃতিও যেন বদলে দিল বাংলাদেশ। ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দুই টেস্টেই বড় ব্যবধানে হারা দলটি এবার সেই অস্ট্রেলিয়াকেই তাদের নিজেদের মাটিতে হারিয়ে দিল।
ডারউইনের আকাশে উড়ল বাংলাদেশের পতাকা। হাসান মাহমুদের আগুনঝরা বোলিং, তানজিদের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি ও মিরাজের অলরাউন্ড নৈপুণ্যে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নতুন ইতিহাস লিখল বাংলাদেশ।