দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পর নানা কারণে রাজনৈতিকভাবে চাপে থাকা ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) আবারও কট্টর হিন্দুত্বের দিকে ঝুঁকছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন রাজ্যে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা এই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরে জেলা শাসকের কার্যালয়ের পাশে প্রায় দেড় শ বছরের পুরোনো একটি মসজিদ বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়ার ঘটনায় নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি জমিতে মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে নিম্ন আদালতের নির্দেশের পর জেলা প্রশাসন এটি ভেঙে দেয়। মসজিদ কর্তৃপক্ষকে সরকারি জমি দখলের অভিযোগে ৬ কোটি ৪১ লাখ রুপি জরিমানাও করা হয়েছে।
২০২৫ সালে স্থানীয় বজরং দলের এক নেতা মসজিদটি সরকারি জমিতে নির্মিত হয়েছে দাবি করে মামলা করেন। গত ১৬ জুলাই সিটি ম্যাজিস্ট্রেট মসজিদটিকে বেআইনি ঘোষণা করেন। পরে মসজিদ কর্তৃপক্ষ জেলা জজ আদালতে আপিল করলেও তা খারিজ হয়ে যায়। ২ সেপ্টেম্বর ওই সিদ্ধান্তের পরদিনই প্রশাসন মসজিদটি ভাঙার কার্যক্রম শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সমাজবাদী পার্টির সাংসদ ইকরা হোসেন প্রশাসনের পদক্ষেপ ঠেকাতে উদ্যোগ নিলেও তাঁকে গৃহবন্দী করে রাখার অভিযোগ ওঠে।
সাহারানপুরের ঘটনাটি অন্য কয়েকটি বিতর্কিত স্থাপনা নিয়ে চলমান আইনি লড়াইয়ের তুলনায় ব্যতিক্রম বলে মনে করছেন সমালোচকেরা। অযোধ্যা, কাশী, মথুরা, সম্ভল ও মধ্যপ্রদেশের ভোজশালাসহ বিভিন্ন স্থানে মসজিদ বা ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু সাহারানপুরে মসজিদ কর্তৃপক্ষকে উচ্চতর আদালতে যাওয়ার সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগ নিয়েই মূলত বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
আগামী বছরের শুরুতে উত্তর প্রদেশ বিধানসভার নির্বাচন। রাজ্যটিতে টানা তৃতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার প্রত্যাশায় রয়েছেন বিজেপির নেতা যোগী আদিত্যনাথ। তবে রাজ্যে ব্রাহ্মণদের মধ্যে অসন্তোষ, বিভিন্ন পরীক্ষায় দুর্নীতি ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের মতো বিষয়গুলো বিজেপির জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একই সময়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর ছাত্রদের নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিও সাড়া ফেলছে। সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠতাও বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়াতে বিজেপি-ঘনিষ্ঠ মহল নতুন করে উগ্র হিন্দুত্বের ইস্যুকে সামনে আনছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
শুধু উত্তর প্রদেশ নয়, দেশের বিভিন্ন রাজ্যেও কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দিল্লিতে এক নাবালিকা ছাত্রীর বাবাকে মারধর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে এক যুবকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিলম্বের অভিযোগ ওঠে। পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিবাদের পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ‘ধর্ম যার যার, উৎসবও তার তার’ স্লোগান সামনে এনেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ধর্মীয় উৎসব সংশ্লিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। দুর্গাপূজার মণ্ডপে আমিষ খাবারের স্টল নিয়েও সংগঠনটির পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়েছে।
মহারাষ্ট্রে নবরাত্রির গরবা ও ডান্ডিয়া অনুষ্ঠানে মুসলমানসহ অহিন্দুদের প্রবেশ নিয়েও বিধিনিষেধের দাবি উঠেছে। এমনকি তিলক না থাকলে প্রবেশের আগে পরিচয়পত্র যাচাইয়ের কথাও বলা হয়েছে।
রামনবমীর রামলীলায় অহিন্দু অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অংশগ্রহণ নিয়েও আপত্তি জানানো হচ্ছে। এর আগে অভিনেতা নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি জানিয়েছিলেন, ২০১৬ সালে উত্তর প্রদেশে তাকে রামনবমীর অনুষ্ঠানে মারীচের ভূমিকায় অভিনয় করতে দেওয়া হয়নি। ২০২২ সালের পর এ ধরনের প্রবণতা আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিজেপির পক্ষ থেকে এসব প্রবণতার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত দলীয়ভাবে স্পষ্ট কোনো অবস্থান দেখা যায়নি। ফলে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দলটি আবারও কট্টর হিন্দুত্বকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে কি না, সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।