গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত মোকাবিলায় সরকারের কাছে ৯০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের পাশাপাশি কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব।
রোববার রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
এর আগে শনিবার রাজধানীর একটি জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধী দলগুলোর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছিলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের কোনো কার্যকর পরিকল্পনা থাকলে তা সরকারকে দিতে। সরকার সেই পরিকল্পনা বিবেচনা করবে বলেও জানান তিনি।
এর পরদিনই নিজেদের প্রস্তাব তুলে ধরে পাল্টা চ্যালেঞ্জ দেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, বিরোধী দল হিসেবে সংসদীয় কমিটিতে দেওয়া সুপারিশগুলো সরকার গত তিন মাসে কতটা বাস্তবায়ন করেছে, সেটিও জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত।
পুরনো কূপ সংস্কারে জোর
মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, ২১ মে জ্বালানি সংকটসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে জামায়াতের পক্ষ থেকে ১০ দফা সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল। পরে ৭ জুন ওই প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করা হয়।
সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্যমান গ্যাসকূপে ওয়ার্কওভার বা সংস্কার করে উৎপাদন বাড়ানো, ভোলা, জামালপুর ও জকিগঞ্জের গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা এবং স্থল ও সমুদ্রভাগে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা।
এ ছাড়া সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং দ্রুত চালু, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ডিজিটাল মনিটরিং, কার্যকর নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা নির্ধারণে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি খাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সাম্প্রতিক সরকারি ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য নতুন মডেল উৎপাদন-অংশীদারত্ব চুক্তি অনুমোদনের উদ্যোগের কথাও সরকারি নথিতে উঠে এসেছে।
‘৯০ দিনে ছয়টি কাজ শুরু করা সম্ভব’
জামায়াতের এই নেতা বলেন, ৯০ দিনের মধ্যে সমুদ্রে নতুন অনুসন্ধান, বড় পাইপলাইন নির্মাণ বা তেল শোধনাগার তৈরি করা সম্ভব নয়। তবে পুরনো ও কম উৎপাদনশীল গ্যাসকূপ সংস্কারসহ বেশ কয়েকটি জরুরি কাজ এই সময়ের মধ্যে শুরু করা সম্ভব।
তার প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম ১৫ দিনের মধ্যে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সকে ওয়ার্কওভারযোগ্য কূপগুলোর অগ্রাধিকার তালিকা প্রকাশ করতে হবে। পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় অনুমোদন শেষ করে ৯০ দিনের মধ্যে কাজ শুরু করার কথা বলেন তিনি।
একই সঙ্গে বর্তমানে বন্ধ বা কম উৎপাদনশীল কূপগুলোর তালিকা প্রকাশ করে কোন কূপ কী কারণে বন্ধ এবং কী ধরনের সংস্কারের মাধ্যমে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব, সে তথ্যও প্রকাশের দাবি জানান তিনি।
ভোলার গ্যাস ব্যবহারের প্রস্তাব
ভোলার গ্যাস দ্রুত কাজে লাগানোর জন্য অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে জামায়াত। গোলাম পরওয়ার বলেন, ভোলা থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস আনার পাইপলাইন দ্রুত নির্মাণ করা সম্ভব না হলেও সিএনজি বা এলএনজিতে রূপান্তরের মাধ্যমে সাময়িকভাবে গ্যাস ব্যবহারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
অবৈধ গ্যাস সংযোগ ও সিস্টেম লস কমানোর ওপরও জোর দেন তিনি। এ ক্ষেত্রে ৯০ দিনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে প্রতি সপ্তাহে কতগুলো অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে, তার পরিসংখ্যান প্রকাশের প্রস্তাব দেন।
গ্যাস সরবরাহের সময়সূচি প্রকাশের দাবি
সংকটের প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরতে গ্যাস সরবরাহের একটি প্রকাশ্য সময়সূচি প্রকাশের দাবি জানিয়েছে জামায়াত।
গোলাম পরওয়ারের মতে, কোন সময়ে আবাসিক, শিল্প ও অন্যান্য খাতে কতটা গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব—তা স্পষ্ট করা হলে ভোক্তা ও শিল্পোদ্যোক্তারা নিজেদের কার্যক্রম পরিকল্পনা করতে পারবেন।
তিনি বলেন, আগে থেকে তৈরি অবকাঠামো কার্যকর না করে শুধু নতুন প্রকল্প ঘোষণা করলে সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। তাই সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং দ্রুত চালুর বিষয়েও তিনি জোর দেন।
এলএনজি আমদানি নিয়েও প্রশ্ন
গ্যাসের আমদানি সক্ষমতা বাড়াতে সরকার সাগরে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। জামায়াত এই উদ্যোগের বিরোধিতা করছে না জানিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, একই সঙ্গে সরকারকে এলএনজি আমদানির ব্যয়, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি এবং পাইপলাইন অবকাঠামো সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য দিতে হবে।
তার বক্তব্য, টার্মিনাল নিজে গ্যাস উৎপাদন করে না। আমদানি করা এলএনজি গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে অর্থ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো—দুটিই দরকার।
সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের শিল্প ও অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি করেছে বলে বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
সরকারের কাছে আরও চার প্রস্তাব
সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি খাত পরিচালনায় চারটি প্রশাসনিক সংস্কারের প্রস্তাবও তুলে ধরে জামায়াত। এর মধ্যে রয়েছে সব অংশীজনকে নিয়ে একটি জাতীয় জরুরি জ্বালানি সেল গঠন এবং নির্দিষ্ট আর্থিক সীমার মধ্যে জরুরি ওয়ার্কওভার ও সংস্কারকাজের অনুমোদনের ক্ষমতা পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের পরিচালনা পর্ষদকে দেওয়া।
এ ছাড়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কবে উৎপাদনে যাবে এবং সেখান থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের সম্ভাব্য দাম কত হবে, তা জনগণকে জানানোর দাবি জানানো হয়। জরুরি দরপত্র মূল্যায়নের জন্য স্থায়ী মূল্যায়ন ব্যবস্থার প্রস্তাবের পাশাপাশি খুলনার খালিশপুরের রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে না যাওয়ার কারণও জানতে চায় দলটি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারকে ব্যর্থ দেখতে চায় না জামায়াত। জ্বালানি সংকটে সরকার ব্যর্থ হলে এর ক্ষতি শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপরই পড়বে।
তিনি আরও বলেন, মানুষ ঘরে গ্যাস, কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ চায়। এসব দাবির রাজনৈতিক সমালোচনার পরিবর্তে কার্যকর সমাধান দেওয়াই সরকারের দায়িত্ব।