ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন–সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালায় সংশোধন এনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব তৈরি করেছে সংস্থাটি। সরকারের অনুমোদন মিললে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও জাতীয় নির্বাচনের মতো সশস্ত্র বাহিনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করতে পারবে।
এ ছাড়া নির্বাচনী আইন সংশোধনের প্রস্তাবে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে পদত্যাগ বাধ্যতামূলক করা, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য মোট ভোটারের ১ শতাংশের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর সংগ্রহের বিধান বাতিল এবং বিভিন্ন পদে প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বৃদ্ধি।
নির্বাচন কমিশন একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারের পাঁচ ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য আচরণবিধির খসড়াও প্রস্তুত করেছে। অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে এসব আচরণবিধিতে বেশ কিছু সংশোধনী প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
ইসি সূত্র জানিয়েছে, আগামী মঙ্গলবার কমিশন সভায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা আইন ও বিধিমালার সংশোধনী প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হবে। এরপর তা আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং সরকারের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। অন্যদিকে আচরণবিধির খসড়া কমিশনের অনুমোদনের পর সরাসরি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে, কারণ এটি নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব এখতিয়ারভুক্ত বিষয়।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, আগস্টে তফসিল ঘোষণা করে অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার প্রস্তুতি চলছে। প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ অথবা পৌরসভা নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। উপজেলা পরিষদের নির্বাচন পরে অনুষ্ঠিত হবে, কারণ এর গঠন কাঠামো ইউপি ও পৌরসভা নির্বাচনের ওপর নির্ভরশীল। তবে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের নির্বাচন সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
আইনে যেসব পরিবর্তনের প্রস্তাব
নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০০৯ সালের স্থানীয় সরকার আইন এবং ২০১৬ সালের সংশোধিত আইনের বিভিন্ন ধারা পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে নির্বাচন কমিশন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা। বর্তমানে পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, র্যাব, আনসার, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও প্রতিরক্ষা সেবা বিভাগ থাকলেও সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী অন্তর্ভুক্ত নেই। সংশোধনী পাস হলে এই বাহিনীগুলোও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করতে পারবে।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে মোট ভোটারের ১ শতাংশের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা বাতিলেরও প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রতীক সংরক্ষণ বিধিমালায়ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাড়তে পারে প্রার্থীদের জামানত
সংশোধনী প্রস্তাব অনুযায়ী—
- পৌরসভার মেয়র প্রার্থীর জামানত ১ লাখ টাকা করার প্রস্তাব।
- সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীর জামানত ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা করার সুপারিশ।
- ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানত ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব।
তবে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে সম্প্রতি জামানত বৃদ্ধি করা হওয়ায় এবার নতুন করে কোনো পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়নি।
এ ছাড়া সংশোধনী কার্যকর হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে আগে চাকরি থেকে পদত্যাগ করতে হবে। তবে বেসরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে না।
আচরণবিধি নিয়ে বড় দলগুলোর সাড়া নেই
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে আচরণবিধির খসড়া নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংলাপে যাচ্ছে না নির্বাচন কমিশন। তবে গত ১০ জুন কমিশন ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পৃথক আচরণবিধির খসড়া প্রকাশ করে রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের মতামত আহ্বান করে।
নিবন্ধিত ৫৬টি রাজনৈতিক দলের কাছে ই-মেইলে খসড়া পাঠানো হলেও বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ অধিকাংশ বড় রাজনৈতিক দল কোনো মতামত দেয়নি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মাত্র ১১টি মতামত জমা পড়ে, যার বেশিরভাগই এসেছে ব্যক্তি পর্যায় এবং কয়েকটি ইসলামী দলের পক্ষ থেকে। সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ জকরিয়াও লিখিত মতামত দিয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, আচরণবিধি চূড়ান্ত করার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো সংলাপে বসার পরিকল্পনা নেই।