জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারসহ ছয় দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে তা এক দফা দাবিতে পরিণত হবে বলে সরকারকে হুঁশিয়ার করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। শনিবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চের বিভিন্ন পথসভা ও সমাবেশে জোটের নেতারা এ হুঁশিয়ারি দেন।
শনিবার সকালে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে পথসভার মধ্য দিয়ে লংমার্চ শুরু হয়। পরে সকাল ৯টার দিকে গাড়িবহর চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করে। পথে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ, কুমিল্লার পদুয়ার বাজার ও চৌদ্দগ্রাম, ফেনীর মহিপাল এবং চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব পথসভায় নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতিতে অনেক স্থানই জনসভায় রূপ নেয়। রাত ৯টার দিকে লংমার্চ চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে পৌঁছালে সেখানে সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচি শেষ হয়।
জোটের পক্ষ থেকে লংমার্চে প্রায় এক হাজার গাড়ি থাকার কথা জানানো হলেও প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত করা যায়নি। কুমিল্লার মেঘনা-গোমতী সেতু দিয়ে ছয় শতাধিক গাড়ি টোল দিয়ে পার হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে বিভিন্ন এলাকার নেতাকর্মীদের গাড়িবহর পথে যুক্ত ও বিচ্ছিন্ন হওয়ায় মোট গাড়ির সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
লংমার্চে জোটের ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে গণভোটের ফল অনুযায়ী জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, গ্যাস-বিদ্যুৎ-সার সংকট নিরসন, জুলাই গণহত্যার বিচার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং দলীয়করণ বন্ধ করা।
লালদীঘি ময়দানের সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, তারা কাউকে বিদায় দিতে চান না। তবে কেউ নিজে থেকে বিদায় নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করলে তখন জনগণ কী করবে, সে প্রশ্নও রাখেন তিনি।
সমাবেশে এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, এবারের লংমার্চ সরকারকে সতর্ক করার জন্য। এখন পর্যন্ত তাদের ‘আঙুল সোজা’ রয়েছে, তবে পরিস্থিতি এমন হলে আঙুল বাঁকাতে বাধ্য করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, গণরায় অনুযায়ী দাবি বাস্তবায়ন না করে সরকার জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। পরিবর্তনের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, বিরোধী দলের সহযোগিতা ছাড়া তারেক রহমানের সরকারের পক্ষে দেশ পরিচালনা কঠিন হবে। নতুন করে কেউ স্বৈরাচারী হওয়ার চেষ্টা করলে তা প্রতিহত করার কথাও জানান তিনি। এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার পর অনেকেই তাদের আগের প্রতিশ্রুতি ভুলে গেছেন।
মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সকাল থেকেই ১১ দলের নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। সেখানে জামায়াতের নেতাকর্মীদের উপস্থিতিই ছিল বেশি। এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কিছু নেতাকর্মীও অংশ নেন।
শাপলা চত্বরের সমাবেশে শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেললে জনগণও কাউকে ছাড় দেবে না। বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশের ঘটনায় গ্রেপ্তার সিফাত আবদুল্লাহর মুক্তিও দাবি করেন তিনি।
পথসভাগুলোতে জোটের নেতারা সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সার সরবরাহ, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও দলীয়করণ নিয়ে সমালোচনা করেন। মিরসরাইয়ের পথসভায় শফিকুর রহমান বলেন, ছয় দফা পূরণ না হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সরকার পতনের এক দফা ঘোষণা করা হবে।
ফেনীর মহিপালেও লংমার্চের গাড়িবহরকে ঘিরে বড় জমায়েত হয়। সেখানে জামায়াত আমির সরকার ও বিএনপির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন। কুমিল্লার পদুয়ার বাজারের পথসভায় তিনি জানান, জনগণের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথে থাকবেন।
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামেও ১১ দলের পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জোটের নেতারা স্থানীয় বিভিন্ন দাবি ও জাতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অনুষ্ঠিত পথসভায়ও সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হয়।
লংমার্চের পর আগামী ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকা-রংপুর রুটে আরেকটি লংমার্চ করার কর্মসূচি রয়েছে ১১ দলীয় জোটের। এরপর খুলনা ও সিলেটের পথে লংমার্চ এবং ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
লংমার্চে ১১ দলীয় জোটের বিভিন্ন শরিক দলের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। বিভিন্ন পথসভায় জামায়াত, এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এবি পার্টি, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, লেবার পার্টি, জাগপা, বিডিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নেতারা বক্তব্য দেন।