আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সেনাবাহিনী গঠনে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
| ফটো কার্ড
 ছবি: Video
ছবি: Video

আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, সময়ের পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতায় ড্রোন প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), স্যাটেলাইট নজরদারি ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হবে।

রোববার ঢাকা সেনানিবাসে সেনাসদর দপ্তরে আয়োজিত ‘সেনাসদর নির্বাচনী পর্ষদ-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ সামুদ্রিক ও সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় ও আন্তঃসীমান্ত হুমকি, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যযুদ্ধ, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং মানবিক সহায়তাসহ বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব বিবেচনায় দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজন অনুযায়ী একটি বাস্তবসম্মত ও টেকসই প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন মডেল অনুসরণ করা জরুরি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শক্তির ভিত্তি শুধু সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা নয়; বরং জাতির ঐক্য, প্রস্তুতি এবং সহনশীলতা। এ লক্ষ্য সামনে রেখে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ধারণার আলোকে নতুন প্রতিরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। সেখানে সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন, শিল্প, প্রযুক্তি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ জনগণকে একটি সমন্বিত জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

তিনি বলেন, বর্তমান যুগে নিরাপত্তার ধারণা বদলে গেছে। শুধু ভৌগোলিক সীমান্ত রক্ষা নয়, এখন সাইবার স্পেস, তথ্যযুদ্ধ, ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোই সরকারের অগ্রাধিকার।

প্রধানমন্ত্রী জানান, সশস্ত্র বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য একটি নতুন রূপরেখা প্রণয়নের কাজ চলছে। এ পরিকল্পনায় বাহিনীর সংখ্যাগত সম্প্রসারণের পরিবর্তে সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, কার্যকারিতা এবং তিন বাহিনীর সমন্বিত সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, সরকারের প্রতিরক্ষা উন্নয়ন পরিকল্পনায় আধুনিক ও শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গঠন, সমন্বিত প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা, যুগোপযোগী প্রতিরক্ষা নীতি, দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ এবং গণতান্ত্রিক সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা এবং সততাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। তাঁর বিশ্বাস, সেনাসদর নির্বাচনী পর্ষদ সেনাবাহিনীতে পেশাদার নেতৃত্ব গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সেনাবাহিনীর প্রতি নিজের আবেগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ক্যান্টনমেন্টের পরিবেশেই তাঁর শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় সময় কেটেছে। তাই সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা, নিয়মনীতি এবং পেশাদার সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচয় রয়েছে। সেনাবাহিনীকে তিনি নিজের বৃহত্তর পরিবারের অংশ বলেও উল্লেখ করেন।

বক্তব্যে তিনি স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা স্মরণ করেন। পাশাপাশি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী অস্থির সময়ে তাঁর নেতৃত্বেই সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বর্ডার রোড প্রকল্প শুধু সীমান্ত নিরাপত্তাই নয়, দুর্গম অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া পার্বত্য এলাকায় মাইন ও বিস্ফোরকমুক্ত করার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদানের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে। তিনি দক্ষিণ সুদানে ড্রোন হামলায় নিহত ছয়জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন।

তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সংকট, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখা এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে।

পদোন্নতির ক্ষেত্রে শারীরিক সক্ষমতার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী মার্কিন জেনারেল এইচ. নরম্যান সোয়ার্জকফের বিখ্যাত উক্তি উদ্ধৃত করেন—“The more you sweat in peace, the less you bleed in war।” তিনি বলেন, সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও শারীরিক সক্ষমতার বিষয়ে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই।

অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী সেনাসদর নির্বাচনী পর্ষদের কার্যক্রমের সফলতা কামনা করেন এবং আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচিত কর্মকর্তারা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব, সক্ষমতা ও গৌরবকে আরও সমৃদ্ধ করবেন।

বিষয়:

এলাকার খবর

সম্পর্কিত