ভারতে সরকারি স্কুলের অবকাঠামো ও শিক্ষকসংকটের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। জেন-জির পর এবার জেন-আলফা প্রজন্মের স্কুলশিক্ষার্থীরাও রাজপথে নেমে আসায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) স্বাধীনতা দিবস থেকে ‘স্কুল ঠিক করো’ নামে যে কর্মসূচি শুরু করেছে, সেটিকে কেন্দ্র করে উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানসহ বিভিন্ন রাজ্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে।
উত্তর প্রদেশের লখনৌয়ে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী কয়েক শ শিক্ষার্থী সরকারি স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে। তাদের অভিযোগ, পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও ইতিহাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক না থাকায় তাদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের এই প্রতিবাদ দেখিয়েছে, সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা এখন শুধু রাজনৈতিক কর্মী বা তরুণদের বিষয় নয়; স্কুলপড়ুয়া কিশোর-কিশোরীরাও তা নিয়ে সরব হচ্ছে।
সিজেপির পক্ষ থেকে সরকারি স্কুলের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয়ের যথাযথ ব্যবহারের দাবি জানানো হয়েছে। দলটির অভিযোগ, সরকারি অর্থ আত্মপ্রচারের বিজ্ঞাপন ও হোর্ডিংয়ে ব্যয় না করে স্কুলগুলোর প্রয়োজনীয় উন্নয়নে ব্যবহার করা উচিত।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঠেকাতে রাজস্থান সরকার সম্প্রতি সরকারি স্কুলে বহিরাগতদের প্রবেশ, ছবি তোলা, ভিডিও ধারণ ও স্কুল নিয়ে প্রচারের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। সরকারের যুক্তি, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা প্রয়োজন। তবে সিজেপি এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেছে, স্কুলের সমস্যা আড়াল না করে সেগুলোর সমাধানে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
এর মধ্যেই ঝাড়খন্ডে সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও রাজনৈতিক প্রভাব ফেলেছে। কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনের পর শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে রাজ্য সরকার। বিরোধী নেতারাও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন।
শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের প্রভাব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও পড়ছে। হায়দরাবাদের নালসার বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে প্রধান অতিথি হিসেবে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একাংশ তাঁর বিরোধিতা করেন। পরে প্রধান বিচারপতি জানান, তিনি ওই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেননি। একই ধরনের ছাত্রবিক্ষোভের আশঙ্কায় মহারাষ্ট্রের টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের সমাবর্তনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বাধীনতা দিবসের বক্তব্যে তরুণদের ‘দিমাগি নকশাল’ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়ার পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা এর সমালোচনা করেছেন। আন্দোলনকারীদের একটি অংশও মনে করছে, সরকারের সমালোচনা করলেই তরুণদের কোনো নেতিবাচক রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত করা উচিত নয়।
সব মিলিয়ে সরকারি শিক্ষা, নিয়োগ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক আন্দোলন ভারতের রাজনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে জেন-জি’র পাশাপাশি জেন-আলফা প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি ভবিষ্যতে আরও বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের রূপ নেয় কি না, সেটিই এখন নজর রাখার বিষয়।