জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, দেশে বিরোধী মত দমনের সংস্কৃতি আবারও ফিরে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাঁর ভাষায়, দেশে একটি ‘ভীতির রাজত্ব’ কায়েমের চেষ্টা চলছে, যা গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক।
শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অবদান’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে ‘সম্প্রীতির জুলাই’ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বিরোধী মত দমনের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। এর বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। গণতন্ত্র শক্তিশালী না হলে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রীয় সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকার যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, বিচার নিশ্চিতকরণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারে কার্যকর পদক্ষেপ নিত, তাহলে বিরোধী দলগুলোও সহযোগিতা করত এবং জাতিও তা সমর্থন জানাত।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারত। তাঁর মতে, জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়নের জন্য বহুমত, বহুধর্ম ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভিত্তিতে বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে।
জুলাই গণআন্দোলনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, আন্দোলনটি ছিল বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের স্বপ্নকে সামনে রেখে গড়ে ওঠা একটি আন্দোলন, যেখানে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেন, আন্দোলনে অন্তত নয়জন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য শহীদ হয়েছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, অতীতে সংখ্যালঘু নির্যাতন, জমি ও মন্দির দখল এবং সাম্প্রদায়িক সংঘাতের বহু ঘটনা ঘটেছে। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনের আগে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি বা অপপ্রচারের মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হতো।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, তাদের উচিত সরকারি ও বিরোধী—সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও সংখ্যালঘুদের আস্থা অর্জনে কাজ করা প্রয়োজন, যাতে তারা নিরাপদ বোধ করেন।
ভারতে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উচিত দক্ষিণ এশিয়ায় একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের উদাহরণ বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা।
সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রোধে সরকারের প্রতি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিভিন্ন গোষ্ঠী দেশে সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টি করে বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। এই ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা সবার দায়িত্ব।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয় মহাথের, ঢাকার সেন্ট মেরিস ক্যাথেড্রাল ও আর্চবিশপ হাউসের পরিচালক ফাদার এলবার্ট টমাস রোজারিও, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, আলী আহসান জুনায়েদ, ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর, গৌড় গোবিন্দ আশ্রমের সহ-সভাপতি শ্যামল চক্রবর্তী, বাংলাদেশ খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জুয়েল আন্তনি চৌধুরীসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বক্তব্য দেন।