ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সোমবার এক সাবেক শিক্ষার্থী সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর ছবির ফ্রেম ভেঙে ছবি ছিঁড়ে ফেলেন। পরে একই স্থানে গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার একটি ছবি টানিয়ে প্রতিবাদ জানায় ছাত্র ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা।
ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি রাখার বিষয়ে ছাত্রদলসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন আপত্তি জানিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও সংগ্রহশালায় জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শন নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছে।
রোববার সংস্কার করা ডাকসু সংগ্রহশালা উদ্বোধনের পর সেখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের আলোকচিত্র ও নিদর্শনের পাশাপাশি জিন্নাহর তিনটি ছবি দেখা যায়। একই সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক কিছু ছবি আগের প্রদর্শনী থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টিও সামনে আসে।
জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদে সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল সমাবেশ করে। এর কিছুক্ষণ পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর ছবির ফ্রেম ভেঙে ছবিগুলো ছিঁড়ে ফেলেন।
আবু তৈয়বের দাবি, ভাষা আন্দোলনের সময় জিন্নাহর ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ বক্তব্যের বিরুদ্ধে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করেছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় জিন্নাহকে স্থান দেওয়া ইতিহাস পুনর্লিখনের চেষ্টা বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গোলাম আযমের ছবি টানিয়ে প্রতিবাদ
জিন্নাহর ছবি স্থাপনের প্রতিবাদে সোমবার বিকেলে ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়ার নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী সংগ্রহশালায় গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার একটি ছবি স্থাপন করেন।
ছাত্র ফেডারেশনের নেতা অর্ক বড়ুয়া বলেন, ইতিহাসকে একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন করা মেনে নেওয়া হবে না। তার দাবি, একাত্তরে গোলাম আযমের ভূমিকার কারণে আশির দশকে বায়তুল মোকাররম এলাকায় তাকে জুতাপেটা করার ঘটনাও ইতিহাসের অংশ এবং সেই ইতিহাস সংরক্ষণ করতেই ছবিটি স্থাপন করা হয়েছে।
২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম ছাত্রদলের
জিন্নাহর ছবি অপসারণের দাবিতে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল।
সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি গণেশচন্দ্র রায় সাহস বলেন, ডাকসুর পক্ষ থেকে একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে তিনি সংগ্রহশালায় বিতর্কিত ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শনের সমালোচনা করেন।
জিন্নাহর ছবি সরানো না হলে উপাচার্যের কার্যালয় ও ডাকসু সংগ্রহশালায় কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের একাংশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ডাকসুকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আদর্শ চর্চার জায়গা না বানিয়ে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের আহ্বায়ক সৈকত আরিফও জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের সমালোচনা করেন। তার দাবি, ভাষা আন্দোলন ও স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসের প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে জিন্নাহকে সংগ্রহশালায় তুলে ধরা ইতিহাস বিকৃতির শামিল।
এদিকে জিন্নাহর ছবি টানানোর প্রতিবাদে বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর জোট গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটও বিক্ষোভ মিছিল করেছে।
ডাকসুর বক্তব্য
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ বলেন, জিন্নাহকে দায়মুক্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে তার ছবি রাখা হয়নি। বরং জিন্নাহ বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছিলেন, সেটিই সংগ্রহশালার প্রদর্শনীতে তুলে ধরা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলার মাধ্যমে যারা প্রতিবাদ করেছেন, তাদের কর্মকাণ্ডকেই বরং জিন্নাহর প্রতি পক্ষপাত হিসেবে দেখা যেতে পারে।
সোমবার রাজধানীর কাকরাইলে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলার বিষয়টি তারা জেনেছেন। যারা রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে অবগত নন, তারাই এ ধরনের আচরণ করতে পারেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
উদীচীর উদ্বেগ
ডাকসু সংগ্রহশালায় ঐতিহাসিক ছবি ও দলিল উপস্থাপনের ধরন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। সংগঠনটির অভিযোগ, জিন্নাহর ছবি যুক্ত করার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভূমিকার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু আলোকচিত্রের উপস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনের ধারাবাহিক ইতিহাস যথাযথ প্রেক্ষাপটে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। পাশাপাশি ইতিহাসবিদ, মুক্তিযুদ্ধের গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতামত নিয়ে সংগ্রহশালার প্রদর্শনী সাজানোর দাবি জানানো হয়েছে।
সংগ্রহশালায় জিন্নাহর তিন ছবি
রোববার ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা সংস্কার করা সংগ্রহশালাটি উদ্বোধন করেন। এ সময় ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সংগ্রহশালায় জিন্নাহর তিনটি ছবি রাখা হয়েছে। এর মধ্যে একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া তার বক্তব্যের সময়কার ছবি। ওই বক্তব্যে তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেছিলেন।
অন্য একটি ছবিতে ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সম্মেলনে জিন্নাহকে দেখা যায়। ওই সম্মেলনে মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবিসংবলিত প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছিল। তৃতীয় ছবিটি ১৯৭০ সালের নির্বাচনসংক্রান্ত পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকার একটি প্রতিবেদন থেকে নেওয়া কাটিং।
প্রশাসনের আপত্তি
ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ ও আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও আপত্তি জানিয়েছে। প্রশাসনের মতে, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শন গ্রহণযোগ্য নয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে তারা।
এ ছাড়া ডাকসুর উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন ছাড়া শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য পৃথক একটি ওয়েবসাইট চালুর বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য নিজস্ব অনুমোদিত নীতিমালা রয়েছে; তাই অনুমোদিত কাঠামোর বাইরে আলাদা কোনো ব্যবস্থা চালুর সুযোগ নেই।