রমজান সাফল্যের ৫টি প্রস্তুতির ধাপ!

নিজস্ব প্রতিবেদক
 ছবি:
ছবি:

যারা রমজানকে ভালোবাসেন, রমজান নিয়ে অনেক কিছু করতে চান, আলহামদুলিল্লাহ তারা ইতিমধ্যেই রমজানের সুবাস পেতে শুরু করেছেন। বিষয়টি অনেকটা এমন—আমের সিজনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাগানে মুকুল এলে সাভারে বসে একজন আম ব্যবসায়ী যেমন তার গন্ধ পান, ঠিক তেমনই। আমগাছের এক মুকুল থেকে আরেক মুকুলে মৌমাছি যেমন গুনগুন করে নেচে বেড়ায়, একইভাবে সত্যিকারের রমজান-প্রেমিকদেরও এখন একটু নড়েচড়ে ওঠার কথা। মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানসহ খুব কাছের মানুষরা তাদের এই পরিবর্তন টের পাওয়ার কথা।

নির্বাচন বনাম রমজান: সময়ের দোটানা এখন সময় নির্বাচনের! নির্বাচনের এই সময় শুরু হয়েছে সেই কবে থেকে? কত আয়োজন, কত উদ্যোগ! কবে তা শেষ হবে? এ নির্বাচনের প্রভাব, ফল, ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া কি আগামী ১৩-১৪ বা ২৮ ফেব্রুয়ারিতেই থেমে যাবে? নিশ্চয়ই না। যারা নির্বাচন নিয়ে গত বছর দেড়েক ধরে দিন-রাত পড়ে আছেন, তারা কি নির্বাচনের রেশ কাটিয়ে এত তাড়াতাড়ি রমজান প্রস্তুতির ভেতরে ঢুকে পড়তে পারবেন? নির্বাচনে বিজয়ী ও বিজিত—উভয়পক্ষই কি হুট করেই রমজানের বিষয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়তে পারবে?

আগামী ১৮ বা ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে রমজান শুরু। তাহলে রমজান প্রস্তুতি শুরু হবে কবে? একটু ভাবুন, নির্বাচন বিশাল এক জনগোষ্ঠীকে রমজান নিয়ে প্রস্তুতির কথা ভাবার সুযোগই দেয় না। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান পেয়েও তা কাজে লাগাতে পারল না, সে চরম হতভাগা!!’ নির্বাচন থেকে যারা কিছুই পাবে না, তারা হয়তো এ নিয়ে আফসোস করতেও পারে। কিন্তু বিজয়ীরা কখনো রমজান হারানোর বেদনায় আফসোস করার সুযোগ পাবে না। নির্বাচনের ফল তাদের আরও অন্যরকম বিষয়ে ডুবিয়ে ফেলবে।

শুধু নির্বাচন নয়, এভাবেই প্রতিদিন, সপ্তাহ, মাস ও বছর করে নানা বিষয়ে আমরা ডুবে যাই। রমজান নিয়ে প্রস্তুতি যার যে অবস্থায় থাক না কেন, রমজানের শেষদিকে ঈদ নিয়ে সবাই মাতামাতিতে লিপ্ত হবেই।

রমজান সাফল্যের ৫টি প্রস্তুতির ধাপ সুরা বাকারার ২৩ রুকুতে রমজান সাফল্যের ব্যাপারে কোরআনের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। সেই সূত্রে রমজান সাফল্যের প্রস্তুতির জন্য ৫টি বিষয় উল্লেখ করা হলো:

১. স্বচ্ছ ধারণা অর্জন: রমজানের গুরুত্ব ও ফজিলত বিষয়ে স্বচ্ছ, সুস্পষ্ট ও বিস্তারিত ধারণা অর্জন করতে হবে। বিশুদ্ধ বিষয় সঠিক উৎস থেকে জানা, সেগুলো বারবার পড়া এবং বেশি বেশি চিন্তা করার কোনো বিকল্প নেই। একটি বিষয় ভালোভাবে উপলব্ধি করলে যে কেউই রমজান নিয়ে আনন্দের সাগরে দুলতে থাকবেন। সেই দোলা তাকে চারপাশের অনেককেই আন্দোলিত করতে বাধ্য করবে।

২. দোয়া: রমজান সাফল্যের দ্বিতীয় প্রস্তুতি হলো দোয়া। দোয়ার মাস রমজানে যদি ঠিকমতো দোয়া করতে চান, তবে দোয়াগুলো আগে শিখতে হবে। রমজানে শিখতে চাইলে পড়বেন কখন? নিজে পারলে অন্যকে খুব সহজেই শেখাতে পারবেন।

৩. নামাজ উপভোগ: রমজানের নামাজ উপভোগ করতে হবে। সারাটা বছর নামাজ উপভোগ না করে, নামাজ উপভোগের কলাকৌশল আয়ত্ত না করে, রমজানে হঠাৎ করে নামাজ উপভোগ করার চিন্তা খুবই বেমানান। যেকোনোভাবে নামাজ উন্নয়নের পদক্ষেপ নিতে হবে।

৪. রোজার হক: রমজানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোজা। মুহাম্মদ (সা.) রমজানের রোজার হক আদায় করার জন্য শাবান মাসে প্রচুর রোজা রাখতেন। আর আমরা সারাটা বছর রোজার কোনো খবর না রেখে হঠাৎ করে রমজানের রোজার হক আদায় করার কথা চিন্তা করি কীভাবে? রোজার আসল উদ্দেশ্য ও প্রায়োগিক অর্থ সম্পর্কে খুব ভালোভাবে বিস্তারিত জানার বিকল্প নেই।

৫. কোরআন পরিকল্পনা: রমজান ও কোরআন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোরআন সম্পর্কে রমজানের যে দাবি, সে ব্যাপারে কোনো পূর্বপরিকল্পনা ও গোছগাছ ছাড়া রমজানে হুট করে সব ঠিকঠাকমতো করার দৃষ্টিভঙ্গিটা অবশ্যই চরম বিভ্রান্তি। রোজা ঠিক না হলে কোরআন ঠিকমতো ধরতে পারবেন না। খতম দেবেন বা পড়বেন, কিন্তু আসল কাজ হবে না।

শাবানের শেষ দিনগুলোর করণীয় কোনো রকম পূর্বপ্রস্তুতি ও পরিকল্পনা ছাড়া মাত্র এক মাসের মধ্যে এসবের সবকিছু সম্পাদন কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। সুতরাং কালবিলম্ব না করে শাবানের সামনের কয়েকটি দিনে রমজান সফল করার যাবতীয় বিষয় সুন্দরভাবে সাজিয়ে নিতে হবে। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, মুসল্লি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী গ্রুপে রমজানের গুরুত্ব, দোয়া, নামাজ, রোজা, কোরআন, সমাজসেবা, জাকাত ব্যবস্থাপনা ও ইতিকাফ নিয়ে নানা ধরনের প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের আয়োজন করতে হবে।

স্রেফ ব্যক্তিগত উন্নয়নে সন্তুষ্টদের শেষ পর্যন্ত পস্তাতে হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। খুব ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে—রমজান শুধু মুমিনদের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য।

হজ্জযাত্রী ও ইমামদের প্রতি বার্তা বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া উচিত ২০২৬-এর হজ্জযাত্রীদের রমজান সাফল্যের প্রতি। মনে রাখতে হবে, রমজান সফল না করে কেউ হজ্জ সফল করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে পুরাতন হজ্জ ও ওমরাহকারীরা খুবই সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারেন।

রমজান সাফল্যে অভাবনীয় দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে মসজিদের ইমামকে। ইমামই হবেন রমজান সাফল্যের সুস্পষ্ট উদাহরণ। এ ব্যাপারে ইমামদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যাবশ্যক।

শয়তান নাকি নিজের নফস? পরিশেষে আমাদের সবাইকে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে হবে—মানুষের প্রকাশ্য শত্রু শয়তানই রমজান সাফল্যের প্রস্তুতির পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতা। তার কারণেই আমরা রমজান প্রস্তুতিকে মোটেও গুরুত্ব দিতে পারি না। কিন্তু একটু মনোযোগ দিয়ে শুনুন, আমাদের অতিশয় সুমহান প্রতিপালক আল্লাহ এ বিষয়ে কী করেছেন। তিনি রমজানের এক মাসে শয়তানকে জিঞ্জিরাবদ্ধ করে বন্দি করার ব্যবস্থা করেছেন। সুবহানাল্লাহ।

তা সত্ত্বেও যদি আমরা শয়তানের সঙ্গে না পারি, তাহলে শয়তানকে দোষারোপ করে কোনোই লাভ হবে না। বরং প্রমাণ হবে আসল কারণ—আমিই শয়তান। রমজানে শয়তান বন্দি থাকতেও যারা শয়তানি ছাড়তে পারব না, তারা রমজান শেষে হজে যাবেন, তখন মিনায় শয়তানের সঙ্গে পারবেন কীভাবে?

এলাকার খবর

সম্পর্কিত