কলম্বিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্প: নিহত ২৬৫, নিখোঁজ ৪৯৬
লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পের চার দিন পরও ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিতদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সোমবারের ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ২৬৫ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৪৯৪ জন। এ ছাড়া ৪৯৬ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
বুধবার প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েয়া হতাহতের সর্বশেষ এই তথ্য জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, উদ্ধার অভিযান এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
সাধারণত বড় ধরনের ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা জীবিতদের উদ্ধারে প্রথম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এই সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও জীবিত উদ্ধারের ঘটনা রয়েছে। তাই উদ্ধারকারীরা এখনো আশা ছাড়ছেন না।
কালির মেয়র আলেহান্দ্রো এদের বলেন, উদ্ধার অভিযান চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবেশ করলেও এর অর্থ এই নয় যে ধ্বংসস্তূপ থেকে আর কাউকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। তবে সময় যত গড়াবে, উদ্ধারকাজ তত কঠিন হয়ে উঠবে।
ধ্বংসস্তূপে এখনও জীবনের সন্ধান
ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে পেরেইরা ও কালি। পেরেইরায় একটি ধসে পড়া বেকারির ধ্বংসস্তূপে রাস্তার বিক্রেতা পাবলো লোয়াইজাকে খুঁজছেন উদ্ধারকারীরা। বিশেষ সরঞ্জামের মাধ্যমে ধ্বংসস্তূপের নিচে সম্ভাব্য প্রাণের সংকেত পাওয়ার পর তাঁর স্বজনেরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন।
পাবলোর ১৬ বছর বয়সী ভাতিজি সারা লোয়াইজা বলেন, উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা ব্যক্তিকে কয়েকবার শব্দ করার অনুরোধ করলে সাড়া পাওয়া গেছে বলে মনে হয়েছে।
কালিতেও তৃতীয় রাত পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান চালানো হয়েছে। খালি হাতের পাশাপাশি ক্রেন, সেন্সর ও প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করছেন উদ্ধারকারীরা। ধ্বংসস্তূপের নিচে কোনো শব্দ পাওয়া যায় কি না, তা শনাক্ত করতে নির্দিষ্ট সময় পরপর পুরো এলাকাকে নীরব রাখা হচ্ছে।
হাজারো বাড়িঘর ধ্বংস
চলতি শতাব্দীতে কলম্বিয়ায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটি হিসেবে এটিকে বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে ৯ হাজার ৫৫০টির বেশি বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে। পেরেইরায় ৮৩ জন এবং কালিতে ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
কালির দক্ষিণাঞ্চলের তোরেস দেল লিমোনা আবাসিক কমপ্লেক্সেও উদ্ধারকাজ চলছে। সেখানে স্থানীয় বাসিন্দারা ধ্বংসস্তূপ সরাতে উদ্ধারকর্মীদের সহযোগিতা করছেন। সৈন্য, সরকারি কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা হাতে হাতে ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজে অংশ নিচ্ছেন।
উদ্ধার অভিযান আরও কার্যকর করতে ঘটনাস্থলে স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। এতে অতিরিক্ত শব্দ ও কম্পন কমায় ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা মানুষের নড়াচড়া শনাক্ত করতে সেন্সর ব্যবহার সহজ হচ্ছে।
পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি
ভূমিকম্পে ধ্বংস হওয়া হাসপাতাল, স্কুল, বাড়িঘর ও অন্যান্য অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে জরুরি তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট দে লা এসপ্রিয়েয়া। একই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থাও ঘোষণা করেছেন তিনি।
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে দুর্গত এলাকায় যাচ্ছেন অনেকে। বিভিন্ন রক্তদান কেন্দ্রের বাইরেও মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
নতুন প্রেসিডেন্টের জন্য বড় পরীক্ষা
দে লা এসপ্রিয়েয়া প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় এই ভয়াবহ দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছেন। ফলে ভূমিকম্পটি তাঁর সরকারের জন্য বড় ধরনের মানবিক ও প্রশাসনিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচনের আগে সরকারি ব্যয় কমানো ও নিরাপত্তা জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর সরকারের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিটের অর্থায়ন কমানোর পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু ভূমিকম্পের পর জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেই সংস্থাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভয়াবহ এই ভূমিকম্প নতুন সরকারের দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতির পাশাপাশি তাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিরও কঠিন পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।