কলকাতার মুসলিম কলোনিতে এক মাস ধরে পানি নেই, উঠছে বৈষম্যের অভিযোগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
| ফটো কার্ড
 ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার কাশীপুর এলাকার জ্যোতিনগর কলোনিতে প্রায় এক মাস ধরে পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে সাড়ে তিন হাজারের মতো বাসিন্দা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বাধ্য হয়ে অনেকে হুগলি নদীর পানি ব্যবহার করছেন।

কলকাতা পুরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত এই কলোনিতে প্রায় ৫০০ পরিবারের বসবাস। বাসিন্দাদের অধিকাংশই মুসলিম। তবে সেখানে কিছু হিন্দু পরিবারও রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এলাকাটি ‘মোল্লা পাড়া’ বা ‘মুসলিম কলোনি’ নামে পরিচিত।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত ২৯ জুলাই রাত থেকে কলোনির পাঁচটি রাস্তার পানির কলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে রাস্তার আলোর সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে বিদ্যুৎ ও রাস্তার আলো চালু হলেও পানি সরবরাহ আর স্বাভাবিক হয়নি।

পানি সরবরাহ বন্ধের পেছনে স্থানীয় বিজেপির বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারির ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন বাসিন্দা। তাঁদের দাবি, নির্বাচনে জয়ের পর এক সভায় তিওয়ারি বলেছিলেন, মুসলিমরা তাঁকে ভোট দেননি, তাই আগামী পাঁচ বছর তিনি তাঁদের জন্য কোনো কাজ করবেন না।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিজেপির পক্ষ থেকে এখনো কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

বাসিন্দারা আরও অভিযোগ করেছেন, তাঁদের কলোনির পানির কলগুলোতে সরবরাহ বন্ধ থাকলেও একই সড়কের পাশে থাকা হিন্দুপ্রধান কলোনিগুলোতে নিয়মিত পানি দেওয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, গত ২৭ জুলাই কলকাতা পুরসভার কর্মীরা কলোনির পানির পাইপলাইন মেরামতের কাজ শুরু করেন। ২৯ জুলাই পর্যন্ত কাজ চলার পর ওই দিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে হঠাৎ পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন পুরনিগমের কার্যালয়ে যোগাযোগ করেও কোনো সমাধান পাননি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

পানি না থাকায় অনেক বাসিন্দাকে হুগলি নদীর ঘাটের পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। স্থানীয়দের একজন জানান, শিশুরা মুখ ধোয়া ও গোসলের জন্য ঘাটে যাচ্ছে। সাঁতার না জানা মানুষও বাধ্য হয়ে নদীতে নামছেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে।

কলোনিতে একটি মসজিদ রয়েছে। পানি সংকটের কারণে সেখানে নামাজের আগে অজু করতেও মুসল্লিদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা।

নদীর পানি ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বাসিন্দা শেখ মইনউদ্দিন বলেন, দূষিত পানি ব্যবহারের পর কয়েকটি শিশুর জ্বর, মাথাব্যথা ও ত্বকের সমস্যা দেখা দিয়েছে। নদীর ঘাটের কাদা ও পিচ্ছিল সিঁড়িতে পড়ে অনেকে আহত হয়েছেন।

বয়স্ক, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে তাঁদেরও নদীর ঘাটে যেতে হচ্ছে।

পানির সংকটের কারণে স্কুলে যাওয়া নিয়েও সমস্যায় পড়েছে স্থানীয় শিশুরা। ইসমা খাতুন নামের এক স্কুলছাত্রী জানিয়েছে, পানি না থাকায় সে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারছে না। পরীক্ষার সময় সংকট শুরু হওয়ায় পড়াশোনাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে বলে তার দাবি।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায় ছয় দশক ধরে এই এলাকায় মানুষ বসবাস করছেন। অধিকাংশ বাসিন্দা নির্মাণশ্রমিক কিংবা স্বল্প মজুরিতে বোতল গলানোর কারখানায় কাজ করেন। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের দরিদ্র মানুষ একসঙ্গে বসবাস করলেও এমন সংকটের মুখে আগে পড়তে হয়নি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে উচ্ছেদের আশঙ্কাও করছেন কলোনির বাসিন্দারা। তবে পানি সরবরাহ বন্ধের কারণ এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে কলকাতা পুরসভা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

বিষয়:

এলাকার খবর

সম্পর্কিত