অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নতুন বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জেরুজালেমের কাছে ‘ই–ওয়ান’ এলাকায় ১ হাজার ২০০টির বেশি আবাসন ইউনিট নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে ইসরায়েলের আবাসন মন্ত্রণালয়। সমালোচকদের আশঙ্কা, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম তীর উত্তর ও দক্ষিণ অংশে বিভক্ত হয়ে যাবে এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আরও সংকুচিত হবে।
ইসরায়েলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পূর্ব জেরুজালেম থেকে পশ্চিম তীর পর্যন্ত ইহুদি বসতিগুলোর একটি ধারাবাহিক ব্লক গড়ে তোলা হবে। এতে পশ্চিম তীরের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি পূর্ব জেরুজালেমও পশ্চিম তীরের বাকি অংশ থেকে আলাদা হয়ে যেতে পারে। অথচ সম্ভাব্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে পূর্ব জেরুজালেমকে বিবেচনা করা হয়।
ইসরায়েলে আগামী অক্টোবরের শেষ দিকে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। তার মাত্র এক সপ্তাহ আগে ই–ওয়ান এলাকায় আবাসন নির্মাণের দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হবে।
ইসরায়েলি বসতি পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন পিস নাউ এই সিদ্ধান্তকে সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংগঠনটির মতে, দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক চাপ ও সমালোচনার কারণে ই–ওয়ান এলাকায় বসতি নির্মাণের পরিকল্পনা আটকে ছিল। বর্তমান সরকার সেটি দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে।
বিভিন্ন পশ্চিমা দেশও ইসরায়েলের বসতি স্থাপন কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানিসহ কয়েকটি দেশ পশ্চিম তীর ও ই–ওয়ান এলাকায় বসতি নির্মাণে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে অংশ না নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছে। তাদের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য আইনি ও সুনামগত ঝুঁকির কথাও বলা হয়েছে।
ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে ও নেদারল্যান্ডসের নেতারাও যৌথ বিবৃতিতে ই–ওয়ান পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং ফিলিস্তিনি অর্থনীতির ওপর নানা বিধিনিষেধের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করতে পারে।
গত বছর ইসরায়েল ই–ওয়ান পরিকল্পনার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। দেশটির কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ তখন বলেছিলেন, পদক্ষেপের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের বিষয়টি আলোচনার টেবিল থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড ই–ওয়ান পরিকল্পনাকে ‘অগ্রহণযোগ্য ও ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এই ধরনের পদক্ষেপ দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং যুক্তরাজ্য তা মেনে নেবে না।
অন্যদিকে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার যুক্তরাজ্যের সমালোচনার জবাবে বলেছেন, ইহুদি জনগণ তাদের ঐতিহাসিক মাতৃভূমির কোথায় বসবাস করবে, সে বিষয়ে যুক্তরাজ্যের পরামর্শ দেওয়া হাস্যকর।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলোকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ বলে মনে করে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশ। এরপরও গত কয়েক বছরে সেখানে অনুমোদনহীন বেশ কিছু ইহুদি বসতি গড়ে উঠেছে এবং পরবর্তী সময়ে এসব বসতির অনেকগুলো ইসরায়েল সরকারের অনুমোদন পেয়েছে।
জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত রিয়াদ মনসুর ই–ওয়ান এলাকায় নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি পরিকল্পনাটি অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
মিসরও ইসরায়েলের নতুন দরপত্রের তীব্র সমালোচনা করেছে। দেশটির মতে, অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের মাধ্যমে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের আইনগত মর্যাদা ও জনমিতিক কাঠামো পরিবর্তনের চেষ্টা দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।