রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় নতুন তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, বাড়ির ছাদে নেশা করতে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ হয়ে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় আটক দুজন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
রোববার দুপুরে রংপুর কোতোয়ালি থানায় সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের। আটক দুজন হলেন একই এলাকার বাসিন্দা মুগ্ধ দাস (২৫) ও সিদ্ধার্থ দাস (২৮)।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার রাতে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে গিয়ে নেশা করছিলেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। বিষয়টি জানতে পেরে গণপতি ছাদে গিয়ে তাঁদের নেশা করতে নিষেধ করেন। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। পরে দুজন শিক্ষকের ঘরে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ান। একপর্যায়ে চারজনকে হত্যা করে বাড়ির বিভিন্ন মালামাল নিয়ে চলে যান বলে পুলিশের দাবি।
ওসি নাজমুল কাদের বলেন, আটক দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের দেওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এর আগে শনিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে রংপুর নগরের কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকার ওই বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং তাঁদের দুই সন্তান আগামী চক্রবর্তী ও আয়ুশ চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, শ্বাসরোধ করে চারজনকে হত্যা করা হয়েছে। গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ বাড়ির তৃতীয় তলার ছাদে পাওয়া যায়। তাঁর গলায় গামছা পেঁচানো ছিল। সিঁড়িতে পাওয়া যায় প্রীতিলতা ও আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ; তাঁদের গলায় দড়ি পেঁচানো ছিল। আর একটি শোবার ঘরের খাটের ফাঁক থেকে আয়ুশের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার গলায় কাপড় পেঁচানো ছিল।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর সিআইডি জানিয়েছে, নিহতদের মুখ কিছুটা ঝলসানো অবস্থায় ছিল। সেখানে কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
রংপুর সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী বলেন, হত্যাকারীরা বাড়ির ভেতরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে চারজনকে হত্যা করেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ডাকাতির উদ্দেশ্যে কেউ বাড়িতে ঢুকে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
ঘটনাস্থলে আলমারি ও ড্রয়ার খোলা এবং বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে টেলিভিশন, ল্যাপটপ ও মুঠোফোনের মতো মূল্যবান জিনিসপত্র নেওয়া হয়নি। আলমারি ও ড্রয়ার ভাঙার চিহ্নও পাওয়া যায়নি। সেগুলো চাবি দিয়ে খোলা হয়েছিল বলে পুলিশের ধারণা।
নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর বোন ও ভাগনি আগামী চক্রবর্তীর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। পরে রাত ২টা ৪০ মিনিটের দিকে প্রীতিলতার মুঠোফোন থেকে একটি কল এলেও তিনি ঘুমিয়ে থাকায় তা ধরতে পারেননি। পরদিন পরিবারের সদস্যদের ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া না পেয়ে তাঁর সন্দেহ হয়। পরে বাড়িতে গিয়ে কাউকে না পেয়ে পুলিশকে খবর দেন তিনি।
নিহত আগামী চক্রবর্তী রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর করেছিলেন। তাঁর ছোট ভাই আয়ুশ চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে নিশ্চিত হতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।